আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্র পথে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল যাচ্ছে বাংলাদেশে। ৭০ বছর পর ফের সরব ডিব্রুগড় নদীবন্দর

৭০ বছর পর ফের সরব ডিব্রুগড় নদীবন্দর

ব্রহ্মপুত্র পথে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল যাচ্ছে বাংলাদেশে

ডিব্রুগড়: দীর্ঘ প্রায় সাত দশক পর ফের আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু করল আসামের ডিব্রুগড়। সোমবার ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বোগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছে একটি নৌযান। ১৯৪৭ সালের পর উজান আসাম থেকে কোনও বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে এটাই প্রথম পণ্যবাহী নদীপথের চালান বলে জানানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালের উপস্থিতিতে এই যাত্রার সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে একাধিক মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। অনলাইনে অনুষ্ঠানে যোগ দেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডের নামরূপ কারখানায় উৎপাদিত মিথানলটি বাংলাদেশের পানগাঁও বন্দরে পৌঁছবে। প্রথম পর্যায়ে নৌযানটি ব্রহ্মপুত্রের ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ ধরে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছবে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট বা IBPR দিয়ে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাবে। ডিব্রুগড়ের বোগিবিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মোট জলপথের দূরত্ব প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার।

এই পরীক্ষামূলক চালানের অন্যতম উদ্দেশ্য হল, উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিতে ব্রহ্মপুত্রকে কতটা কার্যকর ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক জলপথ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তা যাচাই করা।

অনুষ্ঠানে সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, একসময় ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের শব্দ ছিল অত্যন্ত পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু প্রায় ৭০ বছর ধরে সেই নদীপথ কার্যত নীরব ছিল। তাঁর কথায়, এবার ডিব্রুগড় থেকে আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উদ্দেশে নৌযান যাত্রা শুরু করল। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য এখন স্থানীয় নদীপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবেও ডিব্রুগড়ের নদীবন্দরের গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে পৌঁছত। ১৮৮২ সালে শহরের স্টিমার ঘাট থেকে ডিব্রু-সাদিয়া রেলপথ চালু হয়। পরবর্তী সময়ে চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহনে ব্রহ্মপুত্রের জলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পুরনো বাণিজ্যপথে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড়ের নদীর তলদেশেও পরিবর্তন ঘটে। ধীরে ধীরে নদীপথে পণ্য পরিবহন কমতে থাকে। ১৯৫৪ সালে ডিব্রুগড় ঘাট থেকে নিয়মিত বুকিং বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঘাটটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

নতুন এই জলপথ প্রকল্পের মাধ্যমে সড়কপথের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে জ্বালানি খরচ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে তুলনামূলকভাবে কম জ্বালানি প্রয়োজন হয়। একইসঙ্গে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক জলপথ সংযোগ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে ভারতের।

এই উদ্যোগে ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া, আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস, কোচিন বাঙ্কার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট অংশীদাররা যুক্ত রয়েছে। ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে এই চালান সফল হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য পরিবহনে ব্রহ্মপুত্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক জলপথের ব্যবহার আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

और पढ़ें

error: Content is protected !!