অরুণাচলে বাঁধবিরোধী আন্দোলন ঘিরে ভয়াবহ উত্তেজনা, পাসিঘাটে NHPC কার্যালয়ে আগুন

১২ ঘণ্টার বন্ধে তিন জেলা অচল, পুলিশের কাঁদানে গ্যাসে আহত মহিলা ও নিরাপত্তাকর্মীরা; দুটি পুলিশ গাড়িতেও আগুন দেওয়ার অভিযোগ।

পাসিঘাট/ইটানগর, ২৪ অক্টোবর: প্রস্তাবিত সিয়াং নদীর বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে অরুণাচল প্রদেশে উত্তেজনা চরমে উঠেছে। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর সিয়াং উপত্যকার তিন জেলায় ১২ ঘণ্টার বন্ধ চলাকালীন আন্দোলনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপে অন্তত চার মহিলা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ ও সিআরপিএফ কর্মীও আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। রাতের দিকে পাসিঘাটে NHPC-র একটি কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং দুটি পুলিশ গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তবে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলির পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিবরণ এখনও পাওয়া যায়নি।

শুক্রবার সকাল প্রায় ৭টা নাগাদ সিয়াং জেলার ডিটে-ডিমে এলাকার ৬৫ নম্বর সেতুর কাছে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ সূত্রের দাবি, আপার সিয়াং জেলার গেকু ও কমকার এলাকা থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন আন্দোলনকারী সেখানে জড়ো হন। তাঁদের একাংশ ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন এবং নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন বলে অভিযোগ।

পুলিশের দাবি, আন্দোলনকারীদের কয়েকজনের হাতে দা, লাঠি ও গুলতির মতো সরঞ্জাম ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়।

অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের উপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাত ও ধোঁয়ার কারণে কয়েকজন মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়েন। অন্তত চার মহিলাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষে চার থেকে পাঁচজন পুলিশ ও সিআরপিএফ কর্মীও আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
দিনভর উত্তেজনার পর রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হওয়ার খবর সামনে আসে। ২৪ অক্টোবর রাত ১২টার পর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাসিঘাটে NHPC-র একটি কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। দুটি পুলিশ গাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়েছে, মেবো এলাকার রানাঘাট সেতুর কাছেও উত্তেজনা ছড়ায় এবং কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কেউ গ্রেফতার হয়েছেন কি না এবং রাতের শেষে পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি তথ্য এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্টের (SUMP) বিরোধিতায় শুক্রবার সকাল ৫টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বন্ধের ডাক দিয়েছিল একাধিক আদিবাসী সংগঠন। ইস্ট সিয়াং, সিয়াং ও আপার সিয়াং জেলায় বন্ধের প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট বন্ধ থাকে, রাস্তাঘাটে যান চলাচল কমে যায় এবং বহু মানুষ বাড়ির বাইরে বেরোননি।

আন্দোলনের অন্যতম দাবিগুলি ছিল—
– প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা ও প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা।
– আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ১০ জন আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া।
– আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর প্রত্যাহার করা।
– স্থগিত করা গ্রামপ্রধানদের পুনর্বহাল করা।
– সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে কেন্দ্রীয় ও আধাসামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা।
তবে বন্ধের প্রভাব সব জায়গায় একরকম ছিল না। পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, সিয়াং জেলার অন্যান্য অংশ এবং আপার সিয়াংয়ের বেশ কিছু এলাকায় কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল। ইস্ট সিয়াংয়ের প্রশাসন আগেই বন্ধকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল এবং আলোচনার পর সেখানে বন্ধ প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও পাসিঘাট ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় দোকানপাট বন্ধ থাকার খবর পাওয়া যায়।
বন্ধের আগের দিন, ২২ অক্টোবর দুপুর ২টা থেকে পাসিঘাটের মিরাকল গ্রাউন্ডে ২৪ ঘণ্টার অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ‘সেভ সিয়াং, সেভ ইনডিজেনাস রাইটস কমিটি’র উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা পরিবারগুলি অংশ নেন।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের পূর্বপুরুষদের জমি, বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকা রক্ষার প্রশ্নে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁদের আরও দাবি, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সরকারের উচিত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট, যার প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১১,২০০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটি এখনও প্রাথমিক সমীক্ষা ও প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
স্থানীয় আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গ্রাম, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বহু মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হতে পারে এবং তাঁদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ও জীবিকা বিপন্ন হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এত বড় বাঁধ নির্মাণের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীদের একাংশ।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের বক্তব্য, সিয়াং নদীর জল সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নদীর উজানে চিনের প্রস্তাবিত বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও সরকারের উদ্বেগের কারণ। তবে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের যুক্তি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের মধ্যে এখনও সমঝোতা হয়নি।
শুক্রবারের সংঘর্ষ এবং রাতের অগ্নিসংযোগের খবর অরুণাচল প্রদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের দাবিগুলি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং ব্যারিকেড ভাঙা ও পাথর ছোড়ার মতো ঘটনা ঠেকাতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এখনও পর্যন্ত অগ্নিসংযোগের ঘটনায় চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি, গ্রেফতারের সংখ্যা এবং পাসিঘাটে রাতের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিবরণ পাওয়া যায়নি। ফলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সিয়াং নদীর প্রস্তাবিত প্রকল্পকে ঘিরে এই সংঘাত এখন জমি, জীবিকা, পরিবেশ, আদিবাসী অধিকার এবং প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের আস্থার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আগে সরকার ও আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির মধ্যে কার্যকর আলোচনা শুরু হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।








