ধলাই, ৪ অক্টোবর: বাম অঞ্চলের মুসলিম নারীদের শিক্ষার পথ যখন নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় কঠিন ছিল, সেই সময়ে শিক্ষার আলোয় এগিয়ে এসে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন খুশবুন নেছা খাতুন চৌধুরী। ধর্মপ্রাণ এই মহিলার জীবনাবসান ঘটল ৯৭ বছর বয়সে। রবিবার সকাল ৮টা নাগাদ ভাগা বাজারের নিজ বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
শুধু একটি পরিবারের মা হিসেবে নয়, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে একজন মুসলিম নারী হিসেবে তাঁর শিক্ষাজীবন ও শিক্ষকতার অধ্যায়ও বিশেষভাবে স্মরণীয়। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় মুসলিম পরিবারের মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রবণতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন খুশবুন নেছা। ১৯৪০ সালে ধলাইয়ের উমা তারা মধ্যবঙ্গ বিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালে কৃতিত্বের সঙ্গে বৃত্তি অর্জন করেন তিনি। পরবর্তীতে পড়াশোনা সম্পন্ন করে শিক্ষকতার পেশায় যোগ দেন।
স্বাধীনতার আগেই শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন খুশবুন নেছা খাতুন চৌধুরী। ধলাই এলপি স্কুলে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি ধলাই উমাতারা বালিকা বিদ্যালয়েও কিছুদিন শিক্ষকতা করেন তিনি। পরবর্তীতে ধলাই বিএনএমপি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে দেন।
আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরী ও খুশবুন নেছা খাতুন চৌধুরীর দাম্পত্য জীবনে তিন পুত্র ও এক কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র জালাল আহমেদ চৌধুরী ছিলেন ব্যবসায়ী। মেজো পুত্র গুলে আহমেদ চৌধুরী পেশায় ইঞ্জিনিয়ার এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। কনিষ্ঠ পুত্র অধ্যাপক সাবির আহমেদ চৌধুরী সোনাইয়ের মাধব চন্দ্র দাস কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ।
অবসর জীবনে অধ্যাপক সাবির আহমেদ চৌধুরী বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভাগা বাজার জামে মসজিদের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ ধলাই মসজিদ সমন্বয় সমিতির সম্পাদক হিসেবেও কাজ করছেন। বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তিনি যুক্ত রয়েছেন।
২০২৩ সাল থেকে বার্ধক্যজনিত কারণে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী ছিলেন খুশবুন নেছা খাতুন চৌধুরী। এরই মধ্যে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জালাল আহমেদ চৌধুরীরও মৃত্যু হয়।
তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই ভাগা বাজার ও সংলগ্ন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। রবিবার বিকেল ৪টায় ভাগা বাজার জামে মসজিদ সংলগ্ন মাঠে সহস্রাধিক মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজ পড়ান ভাগা বাজার জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আফজল হোসেন লস্কর। পরে ভাগা বাজার কবরস্থানে মরহুমাকে দাফন করা হয়।
মুসলিম নারীদের শিক্ষার সুযোগ যখন আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না, তখন সামাজিক বাধা অতিক্রম করে বিদ্যালয়ে যাওয়া, বৃত্তি অর্জন এবং স্বাধীনতার আগেই শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হওয়া খুশবুন নেছা খাতুন চৌধুরীর জীবনকে তাঁর সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় করে তুলেছে। তাঁর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন আগামী প্রজন্মের কাছে নারীশিক্ষার গুরুত্বের একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।







