শৈব তীর্থে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির প্রায় ৫ বছর।

শৈব তীর্থে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির প্রায় ৫ বছর। রোপওয়ের ঘোষণা সামনে, অথচ ভুবন পাহাড়ের সড়ক নিয়েই এখনও প্রশ্ন—প্রকল্প, বন ছাড়পত্র ও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ।

অসমের বরাক উপত্যকার অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভুবন পাহাড়। পাহাড়ের দুর্গম প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রাচীন শিব উপাসনা এবং দীর্ঘদিনের তীর্থযাত্রার কারণে ভুবন পাহাড়কে স্থানীয় মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শৈব তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভুবন পাহাড়ের প্রধান আকর্ষণ ভুবনেশ্বর শিবমন্দির। শিবরাত্রি উপলক্ষে প্রতিবছর বহু ভক্ত পাহাড়ে সমবেত হন। ঐতিহ্যগতভাবে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ভক্তদের তীর্থযাত্রা এই স্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, ভুবন পাহাড়ের সঙ্গে স্থানীয় লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যও গভীরভাবে যুক্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত বিভিন্ন কাহিনি ও বিশ্বাস এই তীর্থক্ষেত্রের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

বরাক উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শৈব তীর্থ Bhuban Mahadev Temple। প্রতি বছর মহাশিবরাত্রিকে কেন্দ্র করে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয় ভুবন পাহাড়ে। ২০২৬ সালের ভুবন তীর্থ উৎসবেও দুই লক্ষের বেশি ভক্তের সমাগমের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এত বিপুল জনসমাগমের পরেও পাহাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন অসম সরকারের মন্ত্রী পরিমল শুক্লবৈদ্য ভুবন মন্দিরের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য অসম দর্শন প্রকল্পের অধীনে ১০ লক্ষ টাকার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। একই অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ভুবন মন্দিরের দিকে যাওয়ার রাস্তা নির্মাণের জন্য Signature Project-এর অধীনে ১০ কোটি টাকা এবং Assam Darshan-এর অধীনে ৪.৯৮ কোটি টাকা অনুমোদিত হয়েছে।


এর আগে, ২০১৮ সালেও ভুবন মন্দিরে মোটরযোগ্য রাস্তা তৈরির পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। তৎকালীন PWD মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, তীর্থযাত্রীদের সুবিধার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় যানবাহন পৌঁছানোর উপযোগী রাস্তা তৈরি করা হবে এবং পরিকাঠামো উন্নয়নে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছিল।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও ভুবন তীর্থকে ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
রাস্তা নির্মাণে বন দফতরের জটিলতা
সরকারি নথিতে দেখা যাচ্ছে, গঙ্গানগর থেকে ভুবন হিল টেম্পল পর্যন্ত ২,০০০ মিটার থেকে ৪,০০০ মিটার অংশের রাস্তা নির্মাণ Signature Project-এর আওতায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বন দফতরের ছাড়পত্রের কারণে প্রকল্পের কাজে বাধা তৈরি হয়।
কাছাড় জেলা প্রশাসনের ২০২৪ সালের নথি অনুযায়ী, ৪ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে বন দফতরের ছাড়পত্র পাওয়ার পর কাজ পুনরায় শুরু করা হয়েছিল। একই নথিতে কৃষ্ণপুর থেকে ভুবন হিল পর্যন্ত আরেকটি রাস্তা ও RCC সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ভুবন পাহাড়ের চূড়ায় যাওয়ার রাস্তা নিয়ে বিষয়টি এত সরল ছিল না। ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বরের সরকারি পরিদর্শন নথিতে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়ায় যাওয়ার রাস্তার জমি বনভূমির আওতায় থাকায় রাস্তার নিয়ন্ত্রণ PWD নাকি বন দফতরের হাতে থাকবে, তা নিয়ে দুটি বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
পরিদর্শনের সময় বর্তমান কাঁচা রাস্তার পাশে স্থানীয়দের তৈরি দোকান, শেড ও অন্যান্য কাঠামোর কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয় এবং সেগুলি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে রাস্তা নির্মাণের ফলে ভবিষ্যতে বনভূমিতে অনিয়ন্ত্রিত মানব বসতি ও বাণিজ্যিক কার্যকলাপ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও সরকারি নথিতে উঠে আসে।

রাস্তার সমস্যা পুরোপুরি মেটার আগেই ভুবন পাহাড়কে ঘিরে সামনে এসেছে আরও বড় পরিকল্পনা—রোপওয়ে।
কেন্দ্রের Parvatmala Pariyojana-র আওতায় গঙ্গানগর পার্ট-VII থেকে ভুবন পাহাড় মহাদেব মন্দির পর্যন্ত প্রায় ২.৭৮ কিলোমিটার রোপওয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এই প্রকল্পের Detailed Project Report বা DPR তৈরির জন্য পরামর্শদাতা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। (উল্লেখ্য, এর আগেও মুখ্যমন্ত্রীর ভ্রমণকালে তিনি ঘোষণা করেছিলেন)

২০২৫ সালের জুনে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বক্তব্য নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয় যে বরাকের ভুবন তীর্থসহ কয়েকটি রোপওয়ে প্রকল্পের feasibility study/প্রাথমিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
অর্থাৎ, ভুবন পাহাড়ে রোপওয়ে এখন একটি প্রস্তাবিত প্রকল্প, যার DPR-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটিকে ইতিমধ্যে নির্মাণাধীন রোপওয়ে হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
প্রশ্ন উঠছে—পুরনো রাস্তার কী হল?
এখানেই স্থানীয় মানুষের প্রশ্ন।
একদিকে প্রায় পাঁচ বছর আগে ভুবন তীর্থের ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, রাস্তার জন্য কোটি কোটি টাকার প্রকল্প, অন্যদিকে এখনও পাহাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঘিরে ভোগান্তির অভিযোগ। তার উপর নতুন করে রোপওয়ের ঘোষণা।
তীর্থযাত্রীদের জন্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—
গঙ্গানগর–ভুবন পাহাড় রাস্তার সম্পূর্ণ কাজ কতটা শেষ হয়েছে?
কোন অংশ এখনও অসম্পূর্ণ?
অনুমোদিত অর্থের মধ্যে কত টাকা খরচ হয়েছে?
রাস্তার কাজের বর্তমান বাস্তব অগ্রগতি কী?
বন দফতরের ছাড়পত্রের পর প্রকল্পের কোন কোন কাজ হয়েছে?
রোপওয়ের DPR-এর বর্তমান অবস্থা কী?
রোপওয়ে নির্মাণের নির্দিষ্ট সময়সীমা আদৌ নির্ধারিত হয়েছে কি না?
বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রীর কথা মাথায় রেখে জল, শৌচাগার, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা কতটা উন্নত হয়েছে?

২০২৬ সালের ভুবন তীর্থ উৎসবের জন্য কাছাড় জেলা প্রশাসন পরিবহণ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, জল, স্যানিটেশন, অগ্নিনিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছিল।
কিন্তু প্রতি বছর কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম হওয়া একটি ধর্মীয় স্থানের জন্য শুধুমাত্র উৎসবের কয়েকদিনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট কি না, তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। ২০২২ সালেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিবরাত্রিতে ২–৩ লক্ষ মানুষের সমাগমের সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছিল।

ভুবন পাহাড় শুধু একটি মন্দির নয়; এটি বরাক উপত্যকার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু ঘোষণার পর বছরের পর বছর কেটে গেলে তীর্থযাত্রীদের স্বাভাবিক প্রশ্ন—কাজের শেষ কোথায়?
রোপওয়ে ভবিষ্যতে ভুবন পাহাড়ের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু তার আগে বা পাশাপাশি বিদ্যমান রাস্তা, নিরাপত্তা, পানীয় জল, শৌচাগার, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও জরুরি ব্যবস্থার বাস্তব উন্নয়নও জরুরি।
ভুবন পাহাড়ে প্রয়োজন শুধু নতুন প্রকল্পের ঘোষণা নয়—প্রয়োজন ঘোষিত প্রকল্পের স্বচ্ছ হিসাব, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং মাটিতে তার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন।
নোট: “প্রায় ৫ বছর” কথাটি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন-প্রতিশ্রুতিকে ভিত্তি করে ব্যবহার করা হয়েছে। রাস্তার প্রকল্পগুলোর কিছু ঘোষণা ২০১৮ সালেও হয়েছিল। তাই প্রতিবেদনে ২০১৮ ও ২০২১—দুই পর্যায়ের তথ্য আলাদা রাখা হয়েছে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

और पढ़ें

error: Content is protected !!