২৩ বছরেও বিচার মেলেনি রণবীর রায় হত্যাকাণ্ডের
কালা-দা-র মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংবাদিক ও সম্পাদক বিশ্বদীপ গুপ্তকে ‘রণবীর রায় স্মারক সাংবাদিকতা পুরস্কার’

শিলচর, ২৫ সেপ্টেম্বর: ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সাংবাদিক ও সংবাদপত্র জগতের পরিচিত মুখ রণবীর রায় ওরফে ‘কালা-দা’ হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ বিচার নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ২০০৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, মহালয়ার দিনে শিলচরের রাঙ্গিরখাড়ি রোডে নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলের চত্বরে নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাতে খুন হন রণবীর রায়। তাঁর ২৩তম প্রয়াণবার্ষিকীতে সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে ফের ক্ষোভ ও প্রশ্ন সামনে এল।
শুক্রবার রণবীর রায়ের প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে শিলচর প্রেস ক্লাব ও বরাক নাগরিক সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনাসভায় তাঁর হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পায়। সভার আলোচনার বিষয় ছিল— ‘শিলচরের পুর নিগম নির্বাচন ও জনগণের প্রত্যাশা।’ অনুষ্ঠানে বক্তারা একদিকে পুর নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও সততার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেন, অন্যদিকে ২৩ বছর আগের রণবীর রায় হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রণবীর রায় ছিলেন ‘সোনার কাছাড়’ পত্রিকা গোষ্ঠীর মালিক ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং গোষ্ঠীর প্রধান বাংলা দৈনিকের প্রাক্তন সম্পাদক। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর একটি স্কুলের চত্বরে তিন হামলাকারী তাঁকে আক্রমণ করে। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরে ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনতার হাতে দুই সন্দেহভাজন নিহত হন। রণবীর রায়ের স্ত্রী অনিতা রায় শিলচর থানায় এফআইআর দায়ের করেন।

হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রথমে কাছাড় পুলিশ শুরু করলেও প্রায় পাঁচ মাস পরও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অসম সরকার তদন্ত CID-এর হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন প্রতিবেদনে বলা হয়, রণবীর রায় হত্যার পাশাপাশি হত্যার পর জনতার হাতে দুই সন্দেহভাজনের মৃত্যুর ঘটনাটিও CID-এর তদন্তের আওতায় আনা হবে।
হত্যার সম্ভাব্য কারণ নিয়েও তখন বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখেছিল পুলিশ। বিশেষ করে রণবীর রায় প্রতিষ্ঠিত আর.আর. মেমোরিয়াল স্কুলের জমি নিয়ে পুরনো বিরোধের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছিল। প্রায় আট বিঘা জমির মালিকানা এবং জমিতে বসবাসকারী কিছু দখলদারকে উচ্ছেদের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথাও তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
আর্থ-সামাজিক উত্থানের গল্প
রণবীর রায়ের জীবন ছিল সংগ্রাম ও প্রতিষ্ঠার এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশ থেকে সপরিবারে কাছাড়ে চলে আসেন তিনি। শিলচরের সেন্ট্রাল রোডে পানের দোকান দিয়ে জীবিকা শুরু করলেও পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। এরপর সত্তরের দশকে ‘সোনার কাছাড়’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে সংবাদপত্র ও মিডিয়া জগতে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। ধীরে ধীরে তিনি সংবাদপত্র জগতের একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।
প্রয়াণবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে শিলচর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শংকর দে দীর্ঘ সময় পরও হত্যাকাণ্ডের সুবিচার না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, একজন সাংবাদিককে নৃশংসভাবে হত্যার পর এত বছর কেটে গেলেও বিচার না হওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি পুলিশ প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে শংকর দে বলেন, রণবীর রায় হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ দুই দশক পরও সুবিচার না হওয়া পুলিশ প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। এটি তাঁর বক্তব্য ও অভিমত হিসেবেই সভায় উঠে আসে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, হত্যাকাণ্ডের পর জনতার হাতে নিহত দুই সন্দেহভাজনকে ঘিরে পরবর্তীতে পৃথক বিচারপ্রক্রিয়াও হয়েছিল। ফলে রণবীর রায় হত্যার মূল মামলা এবং পরবর্তী ওই ঘটনায় হওয়া মামলাকে এক করে দেখা সমীচীন নয়। প্রকাশ্য নথিতে রণবীর রায় হত্যার মূল মামলার বর্তমান চূড়ান্ত বিচারিক অবস্থার নির্ভরযোগ্য তথ্য স্পষ্টভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
আলোচনাসভায় রণবীর রায়ের বর্ণময় ও কর্মমুখর সাংবাদিকতা জীবনের বিভিন্ন দিক স্মরণ করা হয়। সংবাদপত্র জগতে তাঁর অবদান এবং সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথাও বক্তারা তুলে ধরেন।
এদিন সাংবাদিকতা ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘রণবীর রায় স্মারক সাংবাদিকতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয় সাংবাদিক ও সম্পাদক বিশ্বদীপ গুপ্তকে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক নিরঞ্জন দত্ত, শিলচর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শংকর দে, বিশ্ব মানবাধিকার সুরক্ষা কমিশনের আন্তর্জাতিক আজীবন সদস্যা মালবিকা চৌধুরী, সাংবাদিক নিখিল দাশ, কেআরসি ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বদীপ গুপ্ত, বিইউসিএলের মুখ্য আহ্বায়ক কল্পার্ণভ গুপ্ত, আরপিই (এ)-এর বরাক উপত্যকার দায়িত্বপ্রাপ্ত আহ্বায়ক সৌরভ দেব, চিত্র সাংবাদিক সংস্থার সভাপতি হিমাংশু দে এবং যুব সংগঠক জন্মেজয় চৌধুরী প্রমুখ।
সভায় সভাপতিত্ব করেন শিলচর প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি রিতেন ভট্টাচার্য।

✍️ সাবির মজুমদার
তথ্য সংযোগ: Telegraph India








