“বন্ধুত্বের জীবনচক্র”

➤আজকের গল্প “বন্ধুত্বের জীবনচক্র”
লেখক: কল্পতরু নাথ√

একটি ছোট্ট গ্রামে একই পাড়ায় বড় হয়ে উঠেছিল চার বন্ধু—অর্ণব, সুমন, রাহুল আর নীলয়। ছোটবেলায় তাদের পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট। স্কুল, মাঠ, পুকুরের ঘাট আর বিকেলের আড্ডা—এই ছিল তাদের জীবন।

কারও কাছে বেশি টাকা ছিল না, কারও কাছে দামি খেলনা ছিল না। কিন্তু তাদের কাছে ছিল একে অপরের জন্য অফুরন্ত সময়।

স্কুল ছুটির পর চারজন একসঙ্গে মাঠে খেলত। একজনের বাড়িতে আম পাড়লে চারজন ভাগ করে খেত। কারও পরীক্ষায় ভালো ফল হলে সবাই আনন্দ করত, আবার কেউ ফেল করলে বাকিরা তাকে পড়তে সাহায্য করত।

তখন তারা বলত,
“আমরা চারজন সবসময় একসঙ্গে থাকব। আমাদের বন্ধুত্ব কোনোদিন বদলাবে না।”

সময় এগিয়ে গেল।

কলেজে উঠতেই চারজনের পথ একটু একটু করে আলাদা হয়ে গেল। অর্ণব শহরে পড়তে গেল, সুমন ব্যবসায় যোগ দিল, রাহুল চাকরির প্রস্তুতি নিতে লাগল আর নীলয় পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গ্রামেই থেকে গেল।

প্রথমদিকে প্রতিদিন ফোন, প্রতিদিন কথা—সবই চলত। কিন্তু ধীরে ধীরে ফোনের সংখ্যা কমে গেল। ব্যস্ততা বাড়ল, নতুন বন্ধু এল, নতুন সম্পর্ক তৈরি হলো।

একদিন নীলয় বুঝতে পারল, অনেকদিন চার বন্ধুর একসঙ্গে বসা হয়নি।

সে পুরোনো মাঠটার পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল,
“বন্ধুত্ব কি সত্যিই সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়?”

তারপর আরও কয়েক বছর কেটে গেল।

অর্ণব বড় চাকরি পেল। সুমনের ব্যবসা ভালো চলতে শুরু করল। রাহুলও সরকারি চাকরি পেল। কিন্তু নীলয়ের জীবনে নেমে এল এক কঠিন সময়। পরিবারের অসুস্থতা, আর্থিক সমস্যা—সব মিলিয়ে সে ভেঙে পড়ল।

এক রাতে নীলয় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো।

খবর পেয়ে বহু বছর পর চার বন্ধু আবার এক জায়গায় এসে দাঁড়াল।

অর্ণব শহর থেকে ছুটে এল। সুমন নিজের সমস্ত কাজ ফেলে হাসপাতালে পৌঁছাল। রাহুল সারারাত নীলয়ের পাশে বসে রইল।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নীলয়ের চোখে জল এসে গেল।

সে ধীরে ধীরে বলল,
“আমি ভেবেছিলাম আমরা সবাই দূরে চলে গেছি। কিন্তু আজ বুঝলাম, বন্ধুত্ব দূরত্বে হারিয়ে যায় না।”

অর্ণব তার হাত ধরে বলল,
“বন্ধুত্ব প্রতিদিন কথা বলার নাম নয়। বন্ধুত্ব হলো—যখন সবাই চলে যায়, তখনও যে মানুষটা ফিরে আসে।”

চারজনের চোখেই তখন জল।

বছর আবার এগিয়ে গেল।

তাদের চুলে পাক ধরল। সন্তানরা বড় হলো। জীবনের ব্যস্ততা আরও বেড়ে গেল। বছরে হয়তো একবার দেখা হতো, কখনও সেটাও হতো না।

কিন্তু যখনই তারা দেখা করত, মনে হতো—সময়ের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

একদিন চার বন্ধু সেই পুরোনো স্কুলের সামনে এসে দাঁড়াল। স্কুলের দেওয়ালে তখনও তাদের ছোটবেলার আঁকা কিছু দাগ দেখা যায়।

নীলয় হেসে বলল,
“দেখ, আমরা বুড়ো হয়ে গেলাম, কিন্তু এই দেওয়ালটা এখনও আমাদের ছোটবেলাটাকে ধরে রেখেছে।”

সুমন বলল,
“জীবন আসলে একটা বৃত্তের মতো। আমরা যত দূরেই যাই, কোনো না কোনো সময় আবার সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে আসি।”

চার বন্ধু কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

তারা বুঝতে পারল—বন্ধুত্বের জীবনচক্র এমনই।

শৈশবে বন্ধুত্ব হয় খেলতে খেলতে,
যৌবনে বন্ধুত্ব হয় স্বপ্ন ভাগ করে নিতে,
সংসারে বন্ধুত্ব হয় দায়িত্বের ভিড়ে হারিয়ে যেতে,
আর বার্ধক্যে এসে বোঝা যায়—যারা সত্যিই আপন ছিল, তারা কখনও হারিয়ে যায়নি।

জীবনে অনেক মানুষ আসে, অনেক মানুষ চলে যায়। কেউ আসে প্রয়োজনের সময়, কেউ আসে আনন্দের সময়। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধু সেই মানুষ, যার সঙ্গে অনেকদিন কথা না হলেও হৃদয়ের দূরত্ব তৈরি হয় না।

কারণ—

বন্ধুত্বের কোনো বয়স নেই,
কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই,
কোনো শেষ নেই।
জীবন বদলায়, মানুষ বদলায়,
কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব
সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে ওঠে।

আর জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন পেছনে ফিরে তাকায়, তখন হয়তো সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা সাফল্যের কথা মনে থাকে না।

মনে থাকে সেই চারজন বন্ধুর কথা—
যাদের সঙ্গে একদিন কোনো কারণ ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসা যেত।

সেটাই বন্ধুত্বের আসল জীবনচক্র।

©
লেখক: কল্পতরু নাথ।
প্রাক্তন অধ্যক্ষ,
স্বর্ণলক্ষী উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নরসিংপুর, ধলাই, কাছাড়।

সংগ্রহণে: প্রীতম কুমার নাথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

और पढ़ें

error: Content is protected !!